Bepari sir
(1) এরিস্টটলের সরকারের শ্রেণীবিন্যাস
সরকারের শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে প্রাচীন ও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে দুস্তর মতভেদ বর্তমান। সরকারের শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কিত আলোচনা কেবল আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয় নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চার গোড়ার দিকেও এই ধরনের আলোচনা দেখা যায়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সরকারের শ্রেণীবিভাগ করা হয়। এবং বিভিন্ন ধরনের সরকার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। প্রাচীনকালে কিন্তু রাষ্ট্রের শ্রেণীবিভাগ করা হত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আদি গুরু হিসাবে প্রসিদ্ধ গ্রীক পণ্ডিত অ্যারিস্টটল তাঁর প্রখ্যাত ‘রাষ্ট্রনীতি’ (The Politics ) নামক পুস্তকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের শ্রেণীবিভাগ করেছেন। অ্যারিস্টটল সমকালীন গ্রীস দেশের প্রায় ১৫০টি সংবিধান পর্যালোচনা করে এই শ্রেণীবিভাগ করেছেন। বল বলেছেন: “Aristotle made one of the earliest attempts to classify government structures. He distinguished between states ruled by one person, by the few and the many-monarchy, aristocracy and mixed government. His intention was not only to describe but to evaluate and thus he extended his classification scheme to their ‘perverted’ forms, which he labelled tyranny, oligarchy and democracy.” এ ব্যাপারে অ্যারিস্টটল যে নীতি স্থাপন করেছেন, মূলত তার ভিত্তিতেই সরকারের শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কিত সকল আলোচনা প্রতিষ্ঠিত।
স্বাভাবিক ও বিকৃত: অ্যারিস্টটল দু’টি মূল সূত্র বা নীতির পরিপ্রেক্ষিতে শ্রেণীবিভাগ করেছেন। প্রথমটি হল উদ্দেশ্যমূলক নীতি (purpose)। অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা শাসক বা শাসক-শ্রেণীর স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, না জনসাধারণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে? অন্যভাবে বলতে গেলে শাসনব্যবস্থার উদ্দেশ্য কেবল শাসক বা শাসক সম্প্রদায়ের স্বার্থসাধন অথবা সর্বসাধারণের কল্যাণ বিধান? যে শাসনব্যবস্থা জনকল্যাণে নিয়োজিত, অ্যারিস্টটল তাকে স্বাভাবিক শাসনব্যবস্থা বলেছেন। আর শাসিতের কল্যাণের পরিবর্তে কেবল শাসকশ্রেণীর স্বার্থসাধন যে শাসনব্যবস্থার লক্ষ্য অ্যারিস্টটলের মতে তা বিকৃত শাসনব্যবস্থা। অতএব শাসনের উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে তিনি ‘স্বাভাবিক’ (Normal) ও ‘বিকৃত’ (Perverted)—এই দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন।
সংখ্যানীতির ভিত্তিতে শ্রেণীবিভাগ: রাষ্ট্রের শ্রেণীবিভক্তীকরণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় নীতিটি হল সংখ্যানীতি (principle of number)। এর অর্থ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা কতজন ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত আছে? অর্থাৎ শাসকের সংখ্যা একজন, কয়েকজন, না বহুজন? এই সংখ্যানীতির পরিপ্রেক্ষিতে অ্যারিস্টটল তিন শ্রেণীর শাসনব্যবস্থার কথা বলেছেন। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা একজনের হস্তে ন্যস্ত থাকলে এবং জনকল্যাণ সাধনই শাসনব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলে তাকে রাজতন্ত্র (Monarchy) বলে। অর্থাৎ এক ব্যক্তির স্বাভাবিক শাসনই হল রাজতন্ত্র। কিন্তু এক ব্যক্তির দ্বারা শাসিত রাষ্ট্রে শাসন ক্ষমতা যদি কেবল শাসক বা রাজার স্বার্থেই ব্যবহৃত হয়, তবে তাকে স্বৈরতন্ত্র (Tyranny) বলে। অতএব একব্যক্তি শাসিত রাষ্ট্রের বিকৃত শাসনকেই স্বৈরতন্ত্র বলা হয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা পরিচালনায় দায়িত্ব একজনের পরিবর্তে কয়েকজন ব্যক্তির হস্তে ন্যস্ত থাকলে এবং তা জনসাধারণের মঙ্গল বিধানের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলে তাকে অভিজাততন্ত্র (Aristocracy) বলে। অর্থাৎ মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তির স্বাভাবিক শাসনই হল অভিজাততন্ত্র। কিন্তু এই শাসনব্যবস্থা শুধুমাত্র শাসকশ্রেণীর স্বার্থ সাধনে পরিচালিত হলে তা ধনিকতন্ত্র (Oligarchy) হিসাবে গণ্য হয়। অর্থাৎ মুষ্টিমেয় কয়েক ব্যক্তির বিকৃত শাসনই হল ধনিকতন্ত্র। অনুরূপভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা বহুজনের হস্তে ন্যস্ত থাকলে এবং সর্বসাধারণের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলে অ্যারিস্টটলের মতে তা হল গণতন্ত্র (Polity)। অর্থাৎ বহুজন-শাসিত রাষ্ট্রের স্বাভাবিক রূপ হল গণতন্ত্র। আর এর বিকৃত রূপকে বলা হয় জনতাতন্ত্র (Democracy)। জনতাতন্ত্রেও ক্ষমতা বহুজনের হস্তে থাকে, কিন্তু সকলের স্বার্থে পরিচালিত না হয়ে শুধুমাত্র শাসক সম্প্রদায়ের স্বার্থে পরিচালিত হয়।
আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে, দু’টি মূল নীতির ভিত্তিতে অ্যারিস্টটল ছয় প্রকার শাসনব্যবস্থার কথা বলেছেন।
অ্যারিস্টটলের এরূপ শ্রেণীবিভাগ আধুনিককালে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না। মধ্যযুগের পর থেকে এই শ্রেণীবিভাগের বিরুদ্ধে নানারকম বিরূপ সমালোচনা শুরু হয়।
(১) অ্যারিস্টটল রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য করেননি: অ্যারিস্টটল সরকারের শ্রেণীবিভাগ করেননি। তিনি রাষ্ট্রের শ্রেণীবিভাগ করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের শ্রেণীবিভাগ করা যায় না। কারণ উপাদানগত বিচারে সকল রাষ্ট্র একই রকম। এর ফলে কার্যত সরকারেরই শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে। অথচ অ্যারিস্টটল রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ না করায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
(২) সংখ্যার ভিত্তিতে শ্রেণীবিভাগ অচল: বর্তমানে কেবল শাসকের সংখ্যার ভিত্তিতে সরকারের স্বরূপ উপলব্ধি করা যায় না। দৃষ্টান্ত হিসাবে ইংল্যাণ্ডের কথা বলা যায়। সেখানে প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে আছেন একজন রাজা বা রাণী। তাই বলে ইংল্যাণ্ডের শাসনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ অর্থে রাজতন্ত্র বলা যায় না।
(৩) গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারণার সমালোচনা: অ্যারিস্টটল যাকে ‘পলিটি’ (Polity) বলেছেন, তাই বর্তমানে ‘গণতন্ত্র’ (Democracy) হিসাবে অভিহিত হয়। আর গণতন্ত্রকেই এখন সর্বাপেক্ষা কাম্য শাসনব্যবস্থা বলে মনে করা হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে জনতাতন্ত্রকে ‘democracy’ না বলে ‘mobocracy’ বলাই বাঞ্ছনীয়।
(৪) উদ্দেশ্য ও নীতির ভিত্তিতে শ্রেণীবিভাগ অচল: তত্ত্বগতভাবে বর্তমানে সকল রাষ্ট্রই জনসাধারণের মঙ্গল বিধানের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। সেজন্য এখন রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক ও বিকৃত—এই দু’ভাগে বিভক্ত করা যায় না। তবে এখনও রাষ্ট্রকে অনেক সময় দু’টি মূলভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা—পুলিশি রাষ্ট্র (Police State) এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র (Welfare State)। এ ধরনের শ্রেণীবিভাগ প্রকৃতপক্ষে অ্যারিস্টটল কর্তৃক অনুসৃত নীতির ভিত্তিতে করা হয়।
(৫) নগর-রাষ্ট্রের ধারণা অচল: তা ছাড়া, অ্যারিস্টটলের সময়ে গ্রীস দেশের শাসনব্যবস্থা ছিল মূলত নগরকেন্দ্রিক। এক একটি নগরকে নিয়ে এক-একটি রাষ্ট্র গঠিত হত। এগুলো নগর রাষ্ট্র (City-State) নামে পরিচিত। আয়তন, প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যগত বিচারে এগুলো আধুনিক রাষ্ট্র থেকে স্বতন্ত্র ধরনের। সুতরাং নগর-রাষ্ট্র সংক্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে অ্যারিস্টটল রাষ্ট্রের যে শ্রেণীবিভাগ করেছেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
৬) গুণগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তে অ্যারিস্টটল সংখ্যাগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে শ্রেণীবিভাগ করেছেন। এই শ্রেণীবিভাজন বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে না।
(৭) ক্ষমতার বণ্টন এবং আইন-বিভাগ ও শাসন-বিভাগের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তিতে সরকারের অর্থবহ শ্রেণীবিভাগ করা যায়। অ্যারিস্টটল তা অনুধাবন করতে পারেন নি। শ্রেণীবিভাজন সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে অ্যালান বলের অভিমত বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি তাঁর Modern Politics and Government গ্রন্থে বলেছেন: “He (Aristotle) realized, however, that these types did not exist in their pure forms, thus nothing that classification in political science is a search for ‘ideal types.”
https://www.youtube.com/watch?v=cfFtqrFMAwQ
(2) এরিস্টটলের বিপ্লব তত্ত্ব
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এরিস্টটল এর অসাধারণ অবদানের জন্যও তাঁকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তাঁর প্রতিভা ছিল বিভিন্নমুখী এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। নিম্নে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এরিস্টটলের অন্যান্য অবদান সম্পর্কে আলোচনা করা হল-
১. সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান
এরিস্টটল সর্বপ্রথম রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে নীতিশাস্ত্র থেকে পৃথক করে একটি পৃথক বিজ্ঞানের মর্যাদা দান করেন। তিনি গ্রিক রাজনীতির অধ্যয়নে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আরোপ করেন ও একে বিজ্ঞানের পর্যায়ে উন্নীত করেন। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান অর্থাৎ “Master of Science” বলে অভিহিত করেন। বর্তমান রাষ্ট্রবিজ্ঞান তাঁরই সুচিন্তিত ও বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞার ফলস্বরূপ।
২. ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রবক্তা
সরকারের ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতিতে এরিস্টটল সম্পূর্ণ বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে, শাসনক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রের সূচনা অনিবার্য হয়ে পড়ে। তাই তিনি ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রবর্তন করে সরকারের স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধ করতে সচেষ্ট হন।
৩. বিপ্লব তত্ত্ব
এরিস্টটলের মতে, মানুষ যখন তার ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত হয় তখনই সে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিপ্লব সম্পর্কিত তাঁর এ ধারণা আজও অম্লান হয়ে আছে। তাছাড়া বিপ্লবের প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্র ও সরকারের স্থায়িত্ব রক্ষার যেসব উপায়ের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন তার গুরুত্ব আজও হ্রাস পায় নি।
৪. নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রবর্তক
এরিস্টটল আইনের শাসন ও শাসনতান্ত্রিক আইনের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, জনসাধারণের সামগ্রিক কল্যাণ সাধন জনগণের শাসনব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। কারণ আইন যেখানে শাসন করে না সেখানে কোন শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকে না।
৫. আইনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা
এরিস্টটল ব্যক্তিগত সার্বভৌমত্বের চেয়ে আইনের সার্বভৌমত্বকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কোন ব্যক্তি দিতে পারে না, তা সে যতই শক্তিশালী হোক না কেন। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিহিত থাকে আইনের মধ্যে। এ ধারণা হতে সার্বভৌমত্বের আধুনিক ধারণা জন্মলাভ করে।
৬. রাষ্ট্রের লক্ষ্য নির্ধারণে
রাষ্ট্রের লক্ষ্য নির্ধারণে তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের প্রধান ও পবিত্রতম লক্ষ্য হচ্ছে নাগরিকদের জন্য উন্নততর ও কল্যাণকর জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করা, জ্ঞানের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করা ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধন করা।
৭. শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা
এরিস্টটল এর মতে, শিক্ষার মাধ্যমে আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলা যায়। একথা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে আছে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হল আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলা। নাগরিকদের মহত্তর জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করা।
৮. রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কে ধারণা
এরিস্টটলই প্রথম রাষ্ট্রচিন্তাবিদ যিনি অত্যন্ত যৌক্তিকতা ও দক্ষতার সাথে সরকার ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। তিনিই প্রথম বলেছেন যে সরকার পরিবর্তনশীল কিন্তু রাষ্ট্র স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।
৯. আইনের শাসনের প্রাধান্য
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এরিস্টটল এর সবচেয়ে বড় অবদান হল আইনের শাসনের প্রাধান্য। প্লেটো যেমন একজন দার্শনিক রাজাকে আদর্শ রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে কল্পনা করেছেন, তেমনি এরিস্টটল আইনের শাসনকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
১০. ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাষ্ট্র
তিনি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে একটি সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও ব্যক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। কেননা, একটি অন্যটির পরিপূরক।
১১. কল্যাণমূলক রাষ্ট্র
এরিস্টটল সর্বপ্রথম কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা প্রদান করেন। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সকলের তথা সকল পরিবারের জন্য উত্তম জীবনযাপন করা।
১২. স্থিতিশীল সরকার ব্যবস্থা
উন্নয়নের জন্য বর্তমানে স্থিতিশীল সরকারের দাবি অনস্বীকার্য। আর এরিস্টটল স্থিতিশীল সরকারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন এভাবে, “একটি রাষ্ট্র ততদিন টিকে থাকতে পারে, যতদিন সেখানে তার সরকার টিকে থাকতে সমর্থ হয়।
অগাস্টিন গ্রিক ও রোমান সভ্যতা এবং খ্রিস্টীয় সভ্যতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মানুষের জন্য এক অভয়বাণী উচ্চারণ করেন। মধ্যযুগের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তেমন কোনো পুস্তক রচিত না হলেও তিনি “The City of God” গ্রন্থ রচনা করে রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।
সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন: সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন মধ্যযুগের ইতিহাসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। নিম্নে সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১. ইতিহাসের ব্যাখ্যা প্রদান : সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম একটি দিক হলো ধর্মতত্ত্বের নিরিখে ইতিহাসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রদান। ইতিহাসের সাধারণ ব্যবস্থার সাথে তিনি রোমান সাম্রাজ্যের পতনের বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে নির্দেশ করে বলেন,
রোম সাম্রাজ্য খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও তার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ধারা প্যাগান আদর্শ ও ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত ছিল বিধায় ধর্ম পরিকল্পনার সার্থক রূপদানের জন্য প্যাগান ভাবধারায় সম্পৃক্ত রোমান সাম্রাজ্যের পতন ছিল অবশ্যম্ভাবী।
খ্রিস্টানধর্মের অন্তর্নিহিত কোনো দুর্বলতা এর জন্য দায়ী ছিল না বরং তা ছিল ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিরই অনিবার্য ফলশ্রুতি। ইতিহাসের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অগাস্টিন অনেকটা মাউসের মতই শ্রেণি সংগ্রামের নীতি অবলম্বন করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি স্বাভাবিক রাষ্ট্র ও বিশ্বজনীন রাষ্ট্রের স্টোয়িকবাদী আদর্শকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন ।
২. রাষ্ট্র সম্পর্কিত মতবাদ : সেন্ট অগাস্টিন তার ”The City of God” গ্রন্থে মানুষের দ্বৈতসত্তার পার্থক্য অনুসারে রাষ্ট্রকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন । যথা : ক. বিধাতার রাষ্ট্র ও খ. পার্থিব রাষ্ট্র ।
ক. বিধাতার রাষ্ট্র : সেন্ট অগাস্টিনের মতে, বিধাতার রাষ্ট্র প্রতিনিধিত্ব করে মানুষের আত্মার। বিধাতার রাষ্ট্রের নাগরিকগণ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এবং আত্মসুখ বিসর্জন দিয়ে স্রষ্টার প্রতি আসক্ত।
এ রাষ্ট্র মঙ্গলময, ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট যা চিরভাস্বর এবং জ্যোতির্ময়। অগাস্টিন মনে করেন স্থায়ী সুখ একমাত্র বিধাতার রাষ্ট্রেই সম্ভব। যার কারণে বিধাতার সান্নিধ্য লাভকে এর অধিবাসীরা চরম প্রাপ্তি বলে মনে করেন ।
খ. পার্থিব রাষ্ট্র : পার্থিব রাষ্ট্র হচ্ছে মানুরে স্থূল ও দৈহিক গুণাবলির প্রতীক। এ রাষ্ট্র অহংকার ও স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অগাস্টিনের মতে, নিষিদ্ধ গন্ধম ফল ভক্ষণে আদমের পতনের মধ্য দিয়ে যে পাপের সূচনা হয় পার্থিব রাষ্ট্র সেই পাপের ফলশ্রুতি।
এ রাষ্ট্র অস্থায়ী ও ধ্বংসশীল। পৃথিবীর বুকে যতদিন পাপ থাকবে ততদিন এ রাষ্ট্রও থাকবে। এরূপ রাষ্ট্রের লোকেরা কখনো প্রকৃত সুখ-শান্তি লাভ করতে পারবে না ।
৩. ন্যায়তত্ত্ব : অগাস্টিনের স্বর্গীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো ন্যায়তত্ত্ব । গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর পর অগাস্টিনই প্রথম দার্শনিক যিনি ন্যায়বিচার সম্পর্কে মৌলিক ও তথ্যবহুল আলোচনা করেন। অগাস্টিনের মতে, যে রাষ্ট্রে ন্যায়-নীতি নেই সেখানে আইনও থাকতে পারে না।
তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের সদস্যবৃন্দ যখন উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার সাথে সংগতি বিধান করে তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং উক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আরোপিত দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে, তখন সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের সকল সদস্য ন্যায়বান বলে পরিগণিত হয়।
৪. শান্তি নীতি : ন্যায়বিচার তত্ত্বের ন্যায় সেন্ট অগাস্টিন শান্তি সম্পর্কেও মূল্যবান মতবাদ প্রদান করেছেন। সাধারণত যুদ্ধের অনুপস্থিতিকে শান্তি বলে অভিহিত করা হয়।
কিন্তু অগাস্টিন বলেন, শত্রু ব্যতীত যেমন যুদ্ধ হয় না তেমন সৌভ্রাতৃত্ব বা মিলনের অংশীদার ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রাকৃতিক আইনের গতিশীল ধারায় সকল মানুষ ও জীবজন্তু এ ইতিবাচক শান্তির অন্বেষণে লিপ্ত। বিশ্বজনীন দৈবরাষ্ট্র ব্যতীত সত্যিকার ন্যায়বিচার যেমন সম্ভব নয় তেমনি দৈবরাষ্ট্র ছাড়া সত্যিকারের শান্তিও অসম্ভব ।
৫. সম্পত্তি সম্পর্কে ধারণা : সেন্ট অগাস্টিন সম্পত্তি সম্পর্কে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন মতামত প্রদান করেছেন। তার মতে সম্পত্তি হল বিধাতার দান। যা ঐশ্বরিক আইন ও মানবিক । আইনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।
একারণেই মানুষ তার ব্যক্তিগত টা অভাব পূরণের জন্য সম্পত্তি অর্জন করতে পারে। তবে তিনি ‘প্রয়োজন মতো’ কথাটির ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করে বলেন যার যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই যেন সে গ্রহণ করে এবং প্রত্যেকের প্রয়োজন মেটানোর পর অবশিষ্ট সম্পত্তি । সমাজের কল্যাণার্থে ব্যয় করবে।
৬. দাসপ্রথা সম্পর্কে ধারণা : অগাস্টিন দাসপ্রথাকে ন্যায়সংগত বলে অভিমত পোষণ করেছেন। তার মতে, স্রষ্টার দৃষ্টিতে সকল ষ্ট্র মানুষ সমান এবং জাতি, বর্ণ, বংশ নির্বিশেষে সকলের ওপর তার করুণা সমভাবে বর্ষিত।
অগাস্টিনের এই বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে দাসপ্রথাকে ন্যায়সংগত বলা না গেলেও তিনি একে ন্যায়সংগত বলার পক্ষে যুক্তিবাদী। অগাস্টিন যুক্তি দেখান যে, দাসপ্রথা মানুষের পাপের ফল।
তার মতে, দাসদের ভাগ্য তাদের পাপের মাসুল ব্যতীত অন্য কিছু নয়। এজন্য তিনি দাসদের প্রতি সুবিচার এবং সদ্ব্যবহার করতে উপদেশ প্রদান করেন।
৭. মানব চরিত্র : সেন্ট অগাস্টিনের মতে, মানুষের জীবন দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। একটি তার দেহ বা শরীর, অন্যটি তার আত্মা। আত্মা মানুষকে স্বর্গীয় সুখের সন্ধানে ও সৎ পথে থাকার নির্দেশ দেন।
কিন্তু দেহ মানুষকে পার্থিব সুখ সন্ধানে প্ররোচিত করে। এক শ্রেণির মানুষ আত্মার প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিধাতার নির্দেশিত পথে জীবনযাত্রা পরিচালনা করে স্থায়ী শান্তি অর্জন করে।
কিন্তু যারা দেহের প্রতিনিধিত্ব করে, পার্থিব সুখ লাভের বাসনা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং তাদের ওপর নেমে আসে পাপের বোঝা। ফলে তাদের জীবনে শুরু হয় দুঃখ ও যন্ত্রণার অধ্যায় ।
৮. রাষ্ট্র ও সরকার : অগাস্টিনের মতে, মানুষের কামনা-বাসনা থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি। সরকার বা শাসনব্যবস্থা কোনো পাপের ফলশ্রুতি নয় । পাপের ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, যেহেতু পার্থিব সুখ ভোগের আশায় মানুষ পাপ পথে পা বাড়ায় সেহেতু তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজন। তাই প্রতিটি মানুষকে সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা উচিত।
৯. রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে মতবাদ : অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শনের উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত মতবাদ। রাষ্ট্রের উৎপত্তির প্রশ্নে তিনি ঐশ্বরিক মতবাদকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
অগাস্টিন তার ‘দি সিটি অব গড’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের জন্ম বৃদ্ধি ও ধ্বংসের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের ইচ্ছার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন । ঈশ্বর তার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটান কোনো রাষ্ট্রের উৎপত্তি বা পতনের মাধ্যমে। এর ওপর ভিত্তি করে অগাস্টিন তার রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
১০. রাষ্ট্রনায়ক সম্পর্কিত মতবাদ : রাষ্ট্রের শাসক সম্পর্কেও অগাস্টিনের তার নিজস্ব ধারণা ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, পার্থিব রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়কগণ বিধাতার প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হন।
তাই রাষ্ট্র নায়কের আদেশ পালন করা অপরাপর নাগরিকের জন্য অপরিহার্য এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা অন্যায় ও পাপের সমতুল্য ।
১১. রাষ্ট্র ও গির্জা সম্পর্কে মতামত : অগাস্টিনের মতে, রাষ্ট্রের একমাত্র সংস্থা গির্জা যা মানুষের ভালোদিক বিবেচনা করে থাকে। তিনি আরও বলেন, বিধাতার রাষ্ট্রের শাসক স্বয়ং স্রষ্টা এবং গির্জা হচ্ছে এর প্রকৃত প্রতিনিধি।
গির্জার ব্যর্থতার অর্থ হলো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। তাই গির্জাকে উপেক্ষা করা কোনো রাষ্ট্রের উচিত নয়। গির্জার সাহায্যেই রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শাশ্বত মুক্তির পথে পরিচালিত করতে পারে ।
উপসংহার : উপযুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সেন্ট অগাস্টিন একমাত্র দার্শনিক যিনি তার সুচিন্তিত লেখনী ও তত্ত্বের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার গোড়াপত্তন করেন বিশেষ করে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন
জাতি কর্তৃক রোমান সভ্যতার সংস্কৃতি, আচার আচরণ ও জীবনযাত্রার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা প্রতিরোধ করা ও রোমান জাতির ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় অগাস্টিন তার রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রদান করেন।
ভূমিকাঃ ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নাতিশীতােষ্ণ আবহাওয়াতে প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে বর্তমান কালের রাজনৈতিক দর্শনের সমগ্র অনুভূতিগুলি জন্মগ্রহণ করেছিল। আর যে সমস্ত জ্ঞানকুল শিরােমণিদের স্পশে এই দৃর্শন চিন্তার জগত সমৃদ্ধ ও বিকশিত হয়েছিল, যাদের স্পর্শে তা বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করেছিল এবং যারা রাষ্ট্রচিন্তাকে একটা মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন, তাদের মধ্যে প্লেটো এবং তারই শিষ্য এরিস্টটল অন্যতম।
প্লেটো ও এরিস্টটলের পার্থক্যঃ প্লেটো ও এরিস্টটলের চিন্তাধারার পার্থক্য আলােচনা করার পূর্বে এই পার্থক্যের কারণ সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়ােজন।
(১) প্লেটো কল্পনা বিলাসী এরিস্টটল বাস্তববাদীঃ প্লেটো অবরােহ পদ্ধতির অনুসারী। তাই তার মতবাদ সম্পূর্ণভাবে কল্পনাভিত্তিক। কল্পনার সাহায্যে তিনি আদর্শ রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। বাস্তবে যার কোনাে ভিত্তি ছিল না। অপরপক্ষে এরিস্টটল আরােহ পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। সুতরাং তার মতবাদ বাস্তবধর্মী।
(২) ভিন্ন আলােচনা পদ্ধতিঃ প্লেটোর পদ্ধতি ছিল অবরােহ। আর এরিস্টটলের পদ্ধতি ছিল আরােহ। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে এই আরােহ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। কাজেই এরিস্টটলের পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও বলা হয়। প্লেটোর পদ্ধতি অবরােহ বলে একে কাল্পনিক বলে অভিহিত করা হয়।
(৩) ভিন্ন শাসন ব্যবস্থাঃ প্লেটো তার ‘The Republic’ গ্রন্থে শাসনের চূড়ান্ত ক্ষমতা ন্যস্ত করেছেন দার্শনিক রাজার হাতে। তার মতে, প্রকৃত দার্শনিকের সদগুণ অন্য সকলের সদগুণ অপেক্ষা শ্রেয় এবং অভিজ্ঞতা অপেক্ষা প্রজ্ঞা শ্রেয়। অন্যদিকে এরিস্টটলের বিশ্বাস যে, ব্যক্তি বিশেষের বা ব্যক্তি সংস্থার সদগুণ যত বেশীই হােক না কেন আইনের শাসন ছাড়া তা স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত না হয়ে পারে না। এই কারণে তিনি ব্যক্তির হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা ন্যস্ত না করে তা ন্যস্ত করেছেন আইনের হাতে।
(৪) পরিবার তত্ত্বঃ প্লেটোর মতে, সৎ ও ন্যায়পরায়ণ, সুখী ও সুন্দর জীবনযাপন করার জন্য পরিবারের কোনাে প্রয়ােজন নেই। কিন্তু এরিস্টটল এই মতের বিরােধিতা করে বলেন যে, পরিবার মানুষের জৈবিক ও অর্থনৈতিক প্রয়ােজনের স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। যৌন ক্ষুধা, আত্মসংরক্ষণ ও আত্মপ্রবৃত্তি, মানুষের স্বাভাবিক ও সহজাত প্রবৃত্তি এবং এই প্রবৃত্তির সন্তোষজনক সমাধানই মানুষকে পরিবার গঠনে পরিচালিত করে।
(৫) সম্পত্তি সম্পর্কে মতের পার্থক্যঃ প্লেটো তার সাম্যবাদ নীতিতে সম্পত্তি উচ্ছেদের যে প্রস্তাব করছেন। এরিস্টটলের মতে তা ভ্রান্ত ও যুক্তিহীন। তিনি বলেন, সম্পত্তি ব্যতিত মানুষের পক্ষে জীবনধারণ করা সম্ভবপর নয়। ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য মানুষের যেমন অন্নের প্রয়ােজন, তেমনি আশ্রয়ের জন্য প্রয়ােজন বাসস্থান এবং প্রকৃতির হাত হতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য বস্ত্রের প্রয়ােজন। কিন্তু সম্পত্তি ব্যতীত এই সব প্রয়ােজন মেটানাে সম্ভবপর নয়।
(৬) দাসপ্রথা সম্পর্কঃ এরিস্টটল দার্সপ্রথাকে ন্যায় ও যুক্তি সঙ্গত বলেছেন। তিনি বলেন প্রভুর সুখী ও আরামদায়ক জীবনের জন্য দাসপ্রথা অপরিহার্য। কিন্তু প্লেটো এ সম্পর্কে কিছুই বলেননি।
সাদশ্যঃ উপযুক্ত আলােচনার আলােকে বলা যায় যে, প্লেটো ও এরিস্টটলের বৈসাদৃশ্যের মধ্যেই তাদের তুলনামূলক আলােচনা সীমাবদ্ধ নয়। তাদের তুলনামূলক আলােচনাকে আরও পরিশুদ্ধ করতে হলে তাদের মধ্যকার সাদৃশ্যসমূহ আলােচনা করা প্রয়ােজন।
(১) মানব সমাজ প্লেটোঃ এরিস্টটলের মধ্যে প্রথম ও প্রধান সাদৃশ্য হলাে উভয়ই মানব সমাজ সম্পর্কে একই ধারণা পােষণ করেছেন। উভয় দার্শনিক মনে করতেন মানুষ সামাজিক জীব এবং সমাজেই তাকে বাস করতে হবে। নগর রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে তারা উভয়েই তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
(২) শিক্ষাঃ শিক্ষা সম্পর্কে তারা উভয়েই একরকম বক্তব্য পেশ করেন। নাগরিকদের চরিত্র গঠনের এবং মানুষের মানবিক গুণাবলী বিকাশের জন্য তারা উভয়েই শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সাথে সাথে তারা রাষ্ট্রীয় শিক্ষাকে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা হবে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নমুখী।
(৩) নাগরিকতাঃ নাগরিক সম্পর্কে প্লেটো এবং এরিস্টটল উভয়েই উচ্চ মনােভাবের পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রের নিম্ন শ্রেণীর জনসাধারণের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন। রাষ্ট্রের নিম্নশ্রেণীর লােকদেরকে তারা কেউ নাগরিকত্ব দিতে চাননি। তাদের মতে রাষ্ট্রের নাগরিক হবে উচ্চশ্রেণীর লােকেরা।
(৪) সরকারের শ্রেণীঃ সরকারের শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। রাষ্ট্রের ঐক্যের ওপর উভয় দার্শনিকই সবিশেষ গুরুত্ব আরােপ করেন। প্লেটো এবং এরিস্টটল উভয়ই গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন। তারা মিশ্র সরকারকে ‘Best’ সরকার বলে অভিহিত করেন।
এরিস্টটল ছিলেন বাস্তববাদীঃ প্লেটো ও এরিস্টটলের রাষ্ট্রদর্শনের তুলনামূলক আলােচনা থেকে আমার মনে হয় এরিস্টটলই বাস্তববাদী। এরিস্টটল যে একজন বাস্তববাদী দার্শনিক ছিলেন তার অনুসৃত পদ্ধতিসমূহের মধ্যে তা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তার বিশ্লেষণে কল্পনার প্রভাব সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত না থাকলেও নিছক কল্পনার ভিত্তিতে তিনি কোনাে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাতি ছিলেন না। বস্তুত তার মূলগ্রন্থ ‘পলিটিক্স’ একশত আটান্নটি দেশের শাসনব্যবস্থার পর্যালােচনা লব্ধ অভিজ্ঞতার ফসল। অপরদিকে প্লেটো ছিলেন কল্পনাপ্রবণ ও সংশ্লেষণবাদী। তার যুক্তি বিশ্লেষণের পদ্ধতি ছিল অবরােহ প্রকৃতির। তিনি তার যুক্তিগুলােকে সাধারণত রূপক ও উপমার মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। উপযুক্ত আলােচনা থেকে বলা যায় যে, প্লেটো অপেক্ষা এরিস্টটল ছিলেন অধিকতর বাস্তববাদী।
পরিশেষঃ পরিশেষে বলা যায় যে, প্লেটো ও এরিস্টটলের মধ্যে উপযুক্ত রাজনৈতিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকা সত্তেও উভয়ের মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে সাদৃশ্য আছে। প্লেটোর সাথে একমত হয়ে এরিস্টটল রাষ্ট্রকে একটি স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বর্ণনা করেছেন। প্লেটোর মতাে এরিস্টটলও শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারােপ করেছেন। সর্বোপরি গ্রীসের নগর রাষ্ট্রগুলাের দুরবস্থা। তাদেরকে এত শংকিত করেছিল যে ঐ রাষ্ট্রগুলােতে স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে তারা সচেষ্ট হয়েছিলেন। তারা উভয়েই বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের কল্যাণ ও উন্নততর জীবনের লক্ষ্যে রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।
(6) মধ্যযুগ ছিল অরাজনৈতিক
ভূমিকাঃ রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে মধ্যযুগের সূত্রপাত ঠিক কখন থেকে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এ সম্পর্কে দু’ধরনের মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। এক শ্রেণীর মনীষীগণ মনে করেন যে, খ্রিষ্টীয় গির্জার পতনের সময় থেকে এ যুগের সূচনা। দৃষ্টান্তস্বরূপ ম্যাকইলওয়েনের কথা প্রণিধানযােগ্য। অন্য শ্রেণী এ ব্যাপারে ভিন্নমত পােষণ করেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, মধ্যযুগের রাষ্ট্রতত্ত্ব এক ঊষর মরুভূমির মতাে এবং তা প্রায়ই সম্রাট ও পােপের কর্তৃত্ব দ্বন্দ্বের ধূলাে ঝড়ে অশান্ত ছিল।
মধ্যযুগঃ রাষ্ট্র দর্শনের ইতিহাসে কোনাে সময়কে মধ্যযুগ বলা যায়, সে বিষয়ে যথেষ্ট মতভেদ থাকলেও মােটামুটিভাবে ইউরােপের ইতিহাসে ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে ষােড়শ শতাব্দী কালকেই মধ্যযুগ বলা হয়। বস্তুত বর্বর জার্মান জাতি কর্তৃক রােমান সাম্রাজ্যের পতনের অব্যবহিত পরেই মধ্যযুগের সূচনা হয়। রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে মধ্যযুগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।
অরাজনৈতিক বলতে যা বােঝায়ঃ অরাজনৈতিকতা শব্দ দ্বারা সাধারণত এটাই বােঝা যায় যে, রাজনৈতিক প্রবাহ হতে আলাদা কোনাে কর্মকান্ড বা বিষয় অর্থাৎ রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিবর্জিত কোনাে যুগ। মধ্যযুগ মূলত ছিল অরাজনৈতিক- এ মন্তবের অনুকূলে নিম্নোক্ত কারণগুলাে উল্লেখ করা যেতে পারে।
(১) জার্মান জাতির আক্রমণঃ রােমান সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক উৎকৃষ্টতায় সমগ্র বিশ্ববাসী হয়েছিল অভিভূত। রােমানরাও তাতে কম গর্বিত ছিল না। কিন্তু বর্বর জার্মান টিউটন জাতির আক্রমণে তাদের শৌর্য-বীর্য সব নিক্ষেপিত হলাে মহাকালের অন্ধকার গহবরে। ফলে ক্রমান্বয়ে অরাজনৈতিকতা বৃদ্ধি পায় এবং মুক্ত রাজনৈতিক দর্শন সময়ের স্রোতে ভেসে বিলীন হয়ে যায়। যা অরাজনৈকতার সৃষ্টি করে।
(২) খ্রীষ্টধর্মের প্রভাবঃ মধ্যযুগের প্রথমদিকে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রভাবে সমৃদ্ধ লেখক ও ধর্মীয় যাজকদের দ্বারা ধর্মীয় ক্ষমতার সমর্থনে জোরাল মত প্রকাশের সাথে সাথে চার্চের প্রধান পােপ এবং রাষ্ট্রীয় প্রধান সম্রাটের সঙ্গে শুরু হয় একের ওপর অন্যের আধিপত্যের ঠান্ডা লড়াই। ফলে মধ্যযুগের রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট হতে থাকে।
(৩) প্রশাসনিক দুর্বলতাঃ মধ্যযুগের প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিশৃংখলা দেখা দেয়। ইউরােপের পশ্চিমাংশে দেখা যায় সাম্রাজ্যের মধ্যে জার্মানদের প্রশাসনিক দূর্বলতার কারণে সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চার বিকাশ ঘটেনি। সঙ্গত কারণে মধ্যযুগ অরাজনৈতিকতায় পরিণত হয়। তৎকালীন প্রশাসন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়।
(৪) পােপের কর্তৃত্ব বৃদ্ধিঃ পােপের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি মধ্যযুগের রাজনীতিকে অরাজনৈতিকতায় পরিণত করে। মধ্য যুগে পােপের কথাই ছিল আইন। পােপের প্রাধান্য যেন সমগ্র মধ্যযুগকে গ্রাস করে রেখেছিল। মানুষকে তখন বাইবেল নির্দেশিত পথে চলতে বাধ্য করা হতাে। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র অতিক্রম করে চার্চের প্রধান পােপের জাগতিক বিশেষত সম্রাটদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেলে মুক্ত চর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
(৫) স্টোয়িকবাদের প্রভাবঃ মধ্যযুগের অরাজনৈতিকতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলাে স্টোয়িকবাদের প্রভাব। স্টোয়িকবাদ মধ্যযুগের সমস্ত রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনাকে প্রভাবিত করত। এ সময়ে স্টোয়িকবাদের ন্যায় মধ্যযুগের রাজনৈতিক দর্শনও প্রাকৃতিক আইন ও ঈশ্বরের আইনে বিশ্বাসী ছিল। সৃষ্টিকর্তার দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান এই ধারণায় মধ্যযুগের মানুষ আস্থাবান ছিল।
(৬) চার্লসের নেতৃত্বঃ চার্লসের নেতৃত্ব মধ্যযুগের রাজনীতির সুষ্ঠু গতিধারাকে ব্যাহত করে। নবম শতকে সম্রাট চার্লসের নেতৃত্বে সাময়িকভাবে সাম্রাজ্যে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। কিন্তু রাজনীতিতে কোনাে অগ্রগতি সাধিত হয়নি। কিছুকাল পর মহান পােপের আবির্ভাবের সাথে সাথে চার্চের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এর কারণে রাজনৈতিক সমাজে রাষ্ট্রীয় অধিকারও লােপ পায়।
(৭) পুস্তকের স্বল্পতাঃ মধ্যযুগে পুস্তকের স্বল্পতা রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি অন্যতম বাধা হিসেবে দেখা দেয়। উল্লেখযােগ্য যে, সেন্ট অগাস্টিন হতে সেন্ট টমাস এ্যাকুইনাস পর্যন্ত এমন কোনাে রচনা প্রকাশিত হয়নি যা রাষ্ট্রদর্শনের বিশেষ উপযােগী। মধ্যযুগে যেসব পুস্তক রচিত হয়েছিল তা ছিল মূলত ধর্মকেন্দ্রিক। দু’একটা মূল্যবান পুস্তক যা প্রকাশিত হয় তাও প্রাচীন রচনার পুনরাবৃত্তি মাত্র।
(৮) ধর্মীয় চেতনার প্রভাব বিস্তারঃ মধ্যযুগে ইউরােপে ধর্মীয় চেতনার প্রভাব বিস্তার হতে থাকে। মধ্যযুগের শুরু হতেই রাজনৈতিক দর্শন মুক্ত চর্চার অবক্ষয়ের কোলে চলে যেতে থাকে। দিন দিন সমগ্র ইউরােপ ধর্মের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে ওঠে।
(৯) দুই তরবারি তত্ত্বঃ মধ্যযুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য দুই তরবারীতত্ত্ব। এ তত্ত্বের মূল বিষয় হলাে জাগতিক বিষয়ের অধিকর্তা রাজা এবং আধ্যাত্মিক জগতের অধিকর্তা হলেন পােপ। এই তত্ত্বকে উভয়ের মধ্যকার মীমাংসার উপায় বলে অনেকে মনে করতেন। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকরি ছিল না। তাই সমগ্র মধ্যযুগজুড়ে পােপও রাজার সংঘর্ষের কারণে অরাজকতা ও অরাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করে।
(১০) অরাজনৈতিক ও অসৃজনশীলঃ মধ্যযুগের প্রথম অংশে রাষ্ট্রচিন্তা কেবলমাত্র ধর্মীয় চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি এ যুগের দ্বিতীয়াধেও রাষ্ট্রচিন্তা সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয় প্রভাবের বাইরে ছিল না। পার্থিব জগৎ ও রাজনৈতিক বিষয়াদির ব্যাপারে মধ্যযুগ কখনাে মনােনিবেশ করেন। দর্শন বা রাষ্ট্রচিন্তা সংক্রান্ত বিষয়াদি এ যুগের চিন্তাধারার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
(১১) অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীন জীবনঃ বস্তুত রােম সাম্রাজ্যের পতনের ফলে পশ্চিম ইউরােপের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে যে বিরাট শূন্যতার সৃষ্ট হয় তা টিউটন বর্বরদের আদিম প্রকতির গােত্রীয় সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার দ্বারা তা পূরণ করা একান্ত অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে মানুষের জীবনে নেমে আসে অব্যবস্থা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা।
পরিশেষঃ পরিশেষে বলা যায় যে, মধ্যযুগ সমাজ ও রাজনৈতিক চেতনার স্পর্শ পায়নি। এ ছাড়া মুক্ত রাজনীতির চর্চার দ্বার কখনাে উন্মােচিত হতে পারেনি। সুতরাং সার্বিক বিশ্লেষণে Prof. Dunning-এর ভাষায় বলতে দ্বিধা নেই যে, “The Middle age was unpolitical, its aspirations and ideals centered around the form and content of religious belief.”

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন